আমি যেহেতু আমাদের হিন্দুস্থানি পরিচয় নিয়ে আগ্রহী, ফলত রঠা বা ইকবাল নিয়েও আমার আগ্রহ আছে। ভারতীয় ইউনিয়নের কবি শংখ ঘোষও বোধকরি, এইমত একটা হিন্দুস্থানি পরিচয়ের তাড়না বোধ করতেন। ফলত, ইকবাল নিয়ে কথা বলতেন তিনি। আরও বলতেন, মোটাদাগে, দক্ষিণ এশিয়ার বিচিত্র ভাষাভাষী সাহিত্যিকদেরকে বাংলা অনুবাদে নিয়া আসার গুরুত্বের কথা।
হিন্দুস্থান, অধুনা দক্ষিণ এশিয়া, একটা শেয়ার্ড ঐতিহ্য ধারণ করে। আহমদ ছফারা এই ঐতিহ্যের নুয়ান্সটা ফিল করতেন, অনেকটাই। এইজন্যই, তারা হিন্দুস্থানকে বহুজাতির দেশ বলতেন। আরো বলতেন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র দ্বিজাতি নয়, ‘বহুজাতি তত্ত্বের’ প্রমাণ।
রঠা-প্রকৃতির কূপমন্ডুক, পরিচয়বাদীরা এই বহুজাতির ধারণা অস্বীকার করেন। তারা আমাদেরকে কালচারালী হিন্দুস্থানী না বইলা, হিন্দু বলতে আরাম পান। এদের কান্ডজ্ঞানহীন, হীনস্বার্থপ্রসূত জাতীয়তাবাদের বলি আজকের ইন্ডিয়ার কোটি কোটি নমশূদ্র ও মুসলমান নাগরিক।
রবীন্দ্রনাথদের কূপমন্ডুকতার লগে ফাইট করার একটা তরীকা হইতে পারে এই, যে তাদেরকেও পাঠের ও চর্চার আওতায় নিয়া আসা। বোঝাপড়ার জন্য, এর চাইতে ভাল সমাধান বা অস্ত্র আর দুইটা নাই।
এইখানে একটা প্রশ্ন আছে। তা হইল, ‘আমরা’ কারা? বাংগালি পরিচয়ের জায়গা হইতে শংখ ঘোষ আর আমরা এক হইলেও, বাংলাদেশী পরিচয়ের জায়গায় আমরা মোটেও এক নই। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে আমাদের যেইসব দায় থাকে, ঘোষ সাহেবদের সেইসব দায় নাই। ফলে, রঠারে বা ইকবালরে ‘হেজিমনি’ আকারে পাঠ করলে পরে, আমাদের আর্ট কালচারের করিম-রহিমরা কিভাবে মাইর খাইবে, সেই বুঝ-বুদ্ধিও আমাদের থাকা চাই।
শুধু তাই না, হিন্দুস্থানী কবি হিসাবে কবির, ইকবাল বা রঠাদেরকে পাঠ করার যে প্রসিদ্ধ তরীকা আছে, তারেও প্রশ্ন করার দরকার আছে। এইসব তরীকায় বরাবরই তথাকথিত ‘আঞ্চলিক’ কবি-লেখকরা মাইর খায়।
পুথি সাহিত্য নিয়া ইপসিতা হালদারের গবেষণা এই কথারেই প্রমাণিত করে। আমরা যখন কলোনিয়াল কলকাতায় একটা ‘রেনেসা’ হইছিল বইলা প্রচার করি, তখন ভুইলা যাই, এই রেনেসার অন্যতম শরীক আমাদের পুথি সাহিত্যও। যদিও, কলোনির ভিতরে থাকা ‘প্রজারা’ আদৌ ‘রেনেসা’ করতে পারে কি না, সেইটাও একটা বড় প্রশ্ন। খিয়াল করলে দেখবেন, তৎকালীন পূর্ব বাংলার পুথি অরিয়েন্টেড কালচারাল উত্থানের যে মৌড, তার লগে কলকাতার বাবু কালচার বা সো কলড ‘রেনেসার’ মিলের চাইতে অমিল কম নয়।
হজরত ফরহাদ মজহার একখানা কিতাব লেখছিলেন। ‘রক্তের দাগ মুছে রবীন্দ্র পাঠ’। উক্ত কিতাবের ভিতরে যা-ই লেখা থাকুক, আমরা আপাতত এর টাইটেল নিয়া থাকতেছি। কিতাবের নামের বরাতে আমরা দেখি, রঠাকে পাঠ করার জন্য একটা সংগ্রাম আমরারে করতে হইছে (ষাইটের দশকের বাংগালি জাতীয়তাবাদ দ্রষ্টব্য)। দু:খের কথা এই, এখনকার পরিবর্তিত পরিস্থিতে, রঠা-চর্চা আমরারে আরেকটা সংগ্রামের মুখোমুখি দাড় করায়ে ফেলছে। দেখা যাইতেছে, রঠা ‘ফ্যাসিস্টদের একত্রিত হইবার কাবা’ হইয়া গেছেন (সূত্র, রিফাত হাসান)।
আমরা যখন শিল্পরে ‘নৈরাষ্ট্রীয়’ বলি, তখন একটা বিষয় ভুইলা যাই, যে যেকুনু শিল্পের প্রভাবশালী হওয়ার লগে নিপীড়ক ও নিপীড়িতের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। মহাভারত নামক কিতাবের ঐতিহ্যের লগে আমরা পুরা দক্ষিণ এশীয়রা জড়িত হইয়া পড়লেও, এইটা ভুইলা যাওয়া চলবে না, যে মহাভারতের পরাজিতরা বৃহত্তর মগধের আমাদেরই পিতৃপুরুষ-গণ। এই অঞ্চলে মহাভারত নামক কিতাবের হেজিমনি হইয়া উঠার লগে, আমাদের পরাজিত হওয়ার ইতিহাসও অনেকভাবে ভুলাইয়া দেওয়ার বেপার আছে। (ফলত দেখবেন, মহাভারতের নায়কদেরকে খলনায়ক বানাইয়া কাব্য করার চল আছে, কাব্যিক প্রতিরোধ হিসাবে)।
এইরকমভাবে, রবীন্দ্রনাথ-প্রকারের ফিগার যখন কালচার ইন্ডাস্ট্রির আইকন হন, তখন তান পলিটিকস, বয়ান, আদর্শ, ভাষা-প্রশ্ন, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি পাঠকরে প্রভাবিত করে। এই কারণে, পাওয়ার-পলিটিকস সবসময় আইকন বানায়। সেইসব আইকন জনমনে ‘কালচারাল হেজিমনি’ তৈয়ার করে। যার মাধ্যমে শাসক বা শোষকদের শাসনের ও শোষণের পথ বিস্তৃত হয়। হজরত রিফাত হাসানের স্টেইটমেন্ট মোতাবিক আমরা দেখি যে, রঠা গত একযুগে এমন একটা জাতীয় বয়ান তৈয়ারে হেল্প করতেছিলেন, যাতে আমরা একইসাথে রঠাগীত গাইতে পারতাম ও হাসিনার বাকশাল বা সীমান্তের খুনোখুনি প্রশ্নে ‘মোরালি ডিস-এনগেইজড’ থাকতে পারতাম। বলা বাহুল্য, কালচারাল হেজিমনির লগে পাওয়ার পলিটিকসের যোগ নিয়া নানাবিধ পাঠের পরিসর মোটেও অল্প নয়।
নেশন স্টেইটের ভিতরে বসবাসকারী নাগরিক হিসাবে, আমাদের সমস্যা দুইরকম। এক, আমাদেরকে আমাদের দেশের ভিতরে হাজির থাকা শিল্প ও শিল্পীদের লগে বুঝাপড়ার দায় বহন করতে হবে। এদিকে, আমাদেরকে বহির্বিশ্বের লগেও কানেক্ট করতে পারতে হবে। এতে করে আমাদেরকে দুইটা বিষয় জরুর খিয়াল রাখতে হবে- ক. রাষ্ট্রীয় সীমান্তের বাহিরের কুন কালচার সীমান্তের ভিতরকে কতটুকু প্রভাবিত করতেছে, তার। আর, খ. জাতীয়তাবাদী আইকন-মেকিং প্রসেসের যাঁতাকলে আমাদের লোকাল শিল্প পিষ্ট হইতেছে কি না, তার।
জাতীয়বাদ বর্তমান দুনিয়ার যাবতীয় সমস্যার অন্যতম বড় কারণ। জাতীয়বাদ সর্বদাই আমরারে একটা পরিচয়বাদী লড়াইয়ের মুখোমুখি দাড় করায়। পরিচয় কখনোই স্থির, রিজিড কুনু বেপার নায়। আমাদের বাংগালি পরিচয়ের ডাইমেনশন অনেক। আমরা তাই বৃহত্তর মগধের লগে, এমনকি, দক্ষিণ এশিয়ার লগে আমাদের পরিচয়ের রিশতারে জিয়াইয়া রাখতে চাই। এই ক্ষেত্রে, প্রশ্ন সবসময়ই একটা। আর, তা হলো- ‘সেন্টার’।
আমরা যখন রঠার লগে রিশতা করব, তখন সেন্টার কে থাকবে, বা কোথায় থাকবে। আমরা যখন ইকবাল, পশ্চিমবংগ, বৃহত্তর মগধ বা খোদ দক্ষিণ এশিয়ার লগে আসাবিয়াত গড়ব, তখন আমাদের সেন্টারটা কারা হবে, বা কোথায় থাকবে!
বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে, বরাবরই আমরা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের’ প্রতি অনুগত। আমাদের কুনু প্রকারের রিশতাই যেন ‘গণপ্রজাতন্ত্রীর’ উপরে কুনুরূপ আঘাত না নিয়া আসে, সে বেপারে আমাদের ওয়াকিবহাল থাকা চাই।
এদিকে, কুনুরূপ কানেকশন তখনই মিনিংফুল হয়, যখন বেপারটা ‘সেল্ফ’ হইতে স্টার্ট লয়। আমরা কখনোই নিজেদেরকে ভুইলা, খোদারে পাইব না। ঠিক একইভাবে, আমরা যখন রঠা বা ইকবালরে মুক্তির সোপান ভাইবা, গ্রহণ করতে উদ্যত হব, তখন আমাদের শৃংখলিত দশাই প্রকটতর হবে।
হজরত আহমদ ছফা যখন ক্ষোভ প্রকাশ কইরা এইভাবে বলেন, যে ভারতীয় বই বিক্রি করার জন্যই কি আমরা স্বাধীন হইছিলাম; তখন আমরা বুঝি যে আমাদের রাষ্ট্রীয় সীমান্তের একটা ফাংশন আছে। সেই ফাংশনটা হইল, সীমান্তের ভিতরের রাইটারদের জন্য ‘স্যাংচুয়ারী’ তৈয়ার করা। দুর্ভাগ্য এই, যে ছফা একই বেপার রবীন্দ্রনাথের বেলায় আরোপ করতে পারেন নাই। তার এই না পারার পিছনে, চেরাগায়নের প্রতি প্রশ্নহীন তীব্র-অনুরাগরে দায়ী করা সম্ভব।
উপরের আলাপে আমরা বলতে চাইলাম, আমাদের পরিচয় শুধুমাত্র রাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়। আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আগে, আমাদের পরিচয়ের যে সূতাগুলা আছিল, আমাদের নিজেদের প্রয়োজনের স্বার্থেই সেইগুলারে জিন্দা রাখা উচিত। যাতে আমাদের হিস্ট্রিকাল ও কালচারাল সিলসিলাটা আমরা না ভুলি। কিন্তুক, ‘আমরা কারা’, আমাদের ‘পরিচয়’ কি, তা শুধু শেয়ারড হিস্ট্রি ও কালচারের সূতা দিয়া মাপা যায় না। আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের জমানায়, আমাদের আরো অনেক, ‘বহুস্তরীয়’ পরিচয় থাকে। থাকা সম্ভব।
ফলত, নেশনের জায়গা হইতে, আমাদের যাবতীয় কালচার-কেন্দ্রিক লেনাদেনার জায়গায় নেশনকে প্রায়োরিটি দেওয়া উচিত। আমরা এথনিকালি বাংগালি হইলেও, আমাদের নেশনাল পরিচয় ‘বাংলাদেশী’। আমাদের দুনিয়া দেখার শুরুয়াত হয় বাংলাদেশ নামক ‘রাষ্ট্র’ হইতে। যেকুনু কালচার আমদানির বেলায় এই ফ্যাক্ট মনে রাখা চাই। এদিকে, মেকানিকাল কালচার উৎপাদনের যুগে, কাদেরকে আমরা কালচার হিসাবে উৎপাদন ও ডিস্ট্রিবিউশন করতেছি; ও কাদের বেপারে নিরব থাকতেছি, তারও হিসাব নেওয়া চাই।







