পাকিস্তান সৃষ্টির পর ব্রাহ্মণ প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে মুসলমান প্রতিবেশী উৎসাহ আর উল্লাস নিয়ে প্রবেশ করে বলল, দাদা পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে।
যেই ব্রাহ্মণ এদ্দিন আধিপত্য রেখেছে, নিজেকে উঁচু ভেবেছে আচানক মুসলমান প্রতিবেশীর স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা, উল্লাস, উৎসাহ নিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির খবর দেয়াকে সে মেনে নিতে পারেনি। তাও তার বাড়িতে এসে। এ ব্যাপারটা তার সৃষ্টি করা আত্মসম্মানে খুব আঘাত করে।
এই ঘটনার কারণে ‘তিনি’ পূর্ব বঙ্গ বা নব গঠিত পাকিস্তান ছেড়ে ভারত চলে যান।
মানুষ সর্বদা যে সম্মান, আধিপত্য, ক্ষমতা ভোগ করে, আচানক সে জায়গায় অন্যরা বিচরণ করলে তাকে উৎপাত মনে হয়। আর এটাই হয়তো মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।
ইউনুস সরকারের অনেক সমালোচনাই সম্ভব। কিন্তু জুলাইয়ের পর দাড়ি, টুপি, হিজাবওলারা যে ইউনুস সরকার থেকে আলাদা করে বিশেষ কোন সুবিধা পায় নি, তা খোলা চোখেই আমরা দেখতে পাই। ইউনুস সরকার শুধু একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সব মত, পথ, রঙের, ধর্মের, ভাষার নাগরিক মৌলিক যে অধিকারগুলো পায়, সেগুলোকে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চেষ্টা করেছে। এর ফলে দাড়ি, টুপি, হিজাবওয়ালারা এ দেশে গত দুই যুগ যে বদ্ধ পরিবেশে ছিলো, যে প্রতিবন্ধকতা পেতো তা থেকে মুক্তি পেয়ে উন্মুক্ত পরিবেশ পেয়েছে৷ দমবন্ধ অবস্থা থেকে বুকভরে শ্বাস নেয়ার এক সুযোগ পেয়েছে যেন।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে মাজার ভাঙা কি তাদের মৌলিক অধিকার ছিলো? যে অধিকার ইউনুস তাদের দিলো। এইটা একটা ভাল কন্সপিরেসি, যারে ইউনুস প্রথম দিকে ঠেকাতে ব্যর্থ হইছেন বলা যায়। এর উত্তর হলো, সমাজে কিছু অসুখ সবসময় থাকে। সেই অসুখগুলোর উৎস এক নয়। কোনটার উৎস অর্থনৈতিক, কোনটার সামাজিক, কোনটার রাজনৈতিক, কোনটার ধর্মীয়, কোনটার সাংস্কৃতিক; মূলের দিক থেকে অসুখগুলো ভিন্ন হলেও কিছু কিছু দিক মিল থাকা স্বাভাবিক। মাজারের ঘটনাগুলো ছিলো তেমনই অসুখ যার সাথে সামগ্রিকভাবে দাড়ি, টুপি, হিজাবওয়ালাদের মেলানো যাবে না। বিগত সরকারের সময়ে এই অসুখ চেপে রাখা হয়েছে। সারানো হয়নি। এই ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক অসুখগুলো এখন দৃশ্যমান হয়েছে।
চাদাঁবাজিও মৌলিক অধিকার না৷ তাও তো হাটে মাঠে হচ্ছে। ইউনুস সরকারের উচিৎ ছিলো এই অসুখ সারানো কিন্তু অক্ষমতা, অযোগ্যতা বা সমন্বয়হীনতার কারণে তারা সারাতে পারেনি। তবে সামগ্রিক ব্যাপারটায় একটা ইতিবাচক দিক হলো যেই অসুখগুলোর দিকে আমাদের মনোযোগ ছিলো না, সেগুলো আমাদের নজরে এসেছে। এতে অসুখ সারাবার নানান চেষ্টা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে যা আগে ছিলো না।
তাই দাড়ি, টুপি, হিজাবওয়ালাদের উপস্থিতি, ক্ষমতায়ন, তাদের চিন্তার ঢেউ; এগুলো আসলে ইউনুস সরকারের অবদান না। যেটা এখানে প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তা হলো অভ্যুত্থানে সম্মিলিত চেষ্টায় স্বৈরাচারের বহুদিনের কঠিন শিকল ভেঙে যাওয়া ; আর অভ্যুত্থান পরবর্তী ইউনুস সরকার পুরনো শিকলে আবার তাদেরকে বন্দী না করা ও তাদের জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া। এগুলো দেখে যারা ইউনুসের প্রতি খাপ্পা, ডানপন্থী বলে ট্যাগাচ্ছেন তারা ভুল করছেন। তারা মূলত ঐ ব্রাহ্মণের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। অথবা অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে খাতায় ভুল সংখ্যা লিখে অংকের হিসাব কষছেন আর বারবার উত্তর মেলানোর গলদঘর্ম চেষ্টা করছেন কিন্তু উত্তর মিলছে না। তাই তারা আজকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক যে আধিপত্য ভোগ করেছেন, উঁচু তলার হিসেবে ছিলেন তারা এ সময়ে দাড়ি, টুপি, হিজাবওয়ালাদের তাতে ভাগ বসানো দেখে বিচলিত৷ হিসাব মিলাতে চেয়েও পারছেন না, ভুল উত্তরে পৌছাচ্ছেন।
এরকম হওয়ার কারণ হলো; যাদেরকে জেলে, আয়নাঘরে, তথাকথিত নিষিদ্ধ বইয়ের সাথে টিভিতে র্যাব অফিসারের সামনে হাতকড়া অবস্থা ঘাড় নিচু করে দাড়ানো অবস্থায় দেখা যেতো আচানকই তাদেরকে নিজেদের উঠানে হন হন করে চলতে দেখলে তীব্র অস্বস্তি হওয়ারই কথা। ইউনুস ও তার উপদেষ্টাদের পুরনো প্রগতিশীল সতীর্থদের অস্বস্তিটা তেমনই।
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনুসসহ তার উপদেষ্টা পরিষদের প্রায় সবাই সরকারে আসার আগে দীর্ঘদিন নানান কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের দীর্ঘদিনের কাজের রকম, ফিরিস্তি দেখে এটা বলা অত্যুক্তি হবেনা যে প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের এক সমাহার এখানে। আর তাদের প্রণীত গত এগারো মাসের নানান আইন, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, নীতিমালাগুলো মিলিয়ে দেখুন। মনে হতে পারে যে সাম্প্রতিক ইতিহাসে এরচেয়ে পশ্চিমা আলোকিত রেনেসাঁস রুহ সম্পন্ন প্রগতিশীল সরকার আর আসেনি! দরকার হলে এক্সেল শিট নিয়ে ধরে ধরে বসে বসে হিসাব কষুন।
এই সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সরকারের মৌলিক আকৃতি, প্রকৃতি, ধরন বুঝতে না পারলে বিদ্যমান বিভিন্ন মতের মানুষদের ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।