‘সন্ত্রাসবাদ’ দমন নামক এক চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ দুনিয়ার উপর চড়ে বসেছিলো নয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বদৌলতে। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ এই স্লোগান যতটা শুনতে সভ্য লাগে, বাস্তবের ময়দানে ততটাই অসহায়। আমরা দেখতে পারলাম, এই স্লোগানের বিশ্ব রাজনীতি ক্রমাগত স্রোতের সাথে বিভীষিকাময় হয়ে উঠলো মুসলমানদের জন্য। দিনে দিনে এটা হয়ে উঠলো একটা সভ্যতার লড়াই যেখানে নয়া ক্রুসেডের হর্তাকর্তারা বসে আছে নিজেদের লালিত আদর্শ বা আইডিওলজি নিয়ে!
এই দুনিয়ায় রাজনৈতিক আদর্শগুলাই যেন একেকটা হুবহু ‘মাস্ক’ যারে সময়ের খেদমতে বদলাইতে হইতেছে। বাম, ডান, উদার, মৌলবাদী এইসবের ভেতর থেইকা যেইটা সবচেয়ে বেশি ধারালো অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার হইতেছে মুসলমান জাতির বিরুদ্ধে, তা হইল ‘দক্ষিণপন্থা’, বা রক্ষণশীল ডানপন্থা।
এই দক্ষিণপন্থা কেবল থিউরি না, এটা একখানা সুরত, চেহারা, মুখোশ, সিস্টেম, আইডিওলজিকাল হাতিয়ার। এইটা কোন একক দেশ বা দলের পন্থা না; বরং এইটা এক বৈশ্বিক কাঠামো, একখানা আন্তর্জাতিক তাহাজ্জুব যার মূল উদ্দেশ্য হইল মুসলমানরে একঘরে করা, হেয় করা, আর ‘সিভিলাইজড’ দুনিয়া থেইকা তাদের বহিষ্কার করা। এখানে বলাবাহুল্য দক্ষিণপন্থার যে কথা আমরা বলতেছি সেখানে ‘দক্ষিণপন্থার সুরত’ বলতে বোঝানো হচ্ছে যে কীভাবে এই ‘দক্ষিণ পন্থার’ ধোঁয়া তোলা হচ্ছে এবং এজ আ পলিটিক্যাল আইডেন্টিটি ইসলামকে কীভাবে একটু পাশে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে তাদের দক্ষিণ পন্থা বলে এটাই।
এই লেখায় আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো, কেমন করে এই চিন্তা ভাবনা ‘ওয়ার অন টেরর’ এর লেবেল লইয়া মুসলমানদের নিশানা বানাইছে, ও কেন বঙ্গদেশের বামপন্থা কিছু কিছু জায়গায় এই অপারেশনরে প্রশ্নবিদ্ধ না করে বরং তাদের অসাবধানতার কারণে কীভাবে সামাজিক নৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটিয়েছে।
দক্ষিণপন্থার মূল গড়ন চিন্তার জায়গা থেইকা যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত
দক্ষিণপন্থার রাজনীতি (Right-Wing Ideology) সাধারণত তিনটা স্তম্ভে দাঁড়ায়: ১ জাতীয়তাবাদ (Qawmiyyat) ২. ধর্মীয় রক্ষণশীলতা (Mazhab-Parasti) ৩. বাজার নির্ভর পুঁজিবাদ (Sarmayadari) এই তিনটা দিক মিলায়া একরকম ভয়ভীতির রাজনীতি দাঁড় করানো হয়, যারে বলা যায় ‘সিকিউরিটাইজড রাজনীতি’ জাতি নিরাপত্তার নাম দিয়া মানুষরে দমন করা, প্রশ্ন করলেই ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিয়া থামায়া দেওয়া। এইটারে পুজি করেই ইসলামকে আমন্ত্রণ জানানো হয়ে যায় এই ফ্রেমিং-এ। মনে করানো হয় ইসলাম রাষ্ট্র হিসেবে বা চিন্তা হিসেবে এমন জায়গায় আছে। সমস্যা হচ্ছে অনেক মুসলমান শুরু থেকে তাদের কাজকারবার দিয়ে এরমধ্যে এই দক্ষিণপন্থী আচরণ করলেও, বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমান ডেমোক্রেটিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যেই বসবাস করছে ও নিজেদের রাষ্ট্রচিন্তার জানান দিচ্ছে। এখন দক্ষিণপন্থা ও ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার মৌলিক পার্থক্য বললে দক্ষিণপন্থা মূলত ইউরোপীয় প্রেক্ষাপটের একটি ধারণা, যেখানে কনজারভেটিভ নীতি, জাতিরাষ্ট্র (nation-state), জাতীয়তাবাদ, প্রাইভেট সম্পত্তি ও বাজার অর্থনীতি কেন্দ্রীয় গুরুত্ব পায়। অপরদিকে ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে, তাদের ভাষায়, ‘উম্মাহর ঐক্য’ (pan-Islamic unity) ধারণাকে অগ্রাধিকার দেয়। এই ‘উম্মাহ’ মানুষের পরিচয়কে ধর্ম ও ‘ঈমান’ভিত্তিক বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বে এক করে, আর জাতীয়তাবাদ পরিচয়কে ভূখণ্ড, ভাষা ও জাতিগত সীমানায় সীমাবদ্ধ করে। এয়ুরোপিয় জাতি রাষ্ট্র ও এককেন্দ্রিক ভাষিক এবং এথনিক জাতীয়তাবাদ থেকে ‘উম্মাহ’ ধারণা এজন্যই আলাদা। তাই ঐ ‘উম্মাহ’ এর ধারণার ক্রিটিক হাজির করতে হলে জাতীয়তাবাদের ক্রিটিকের বাইরে গিয়ে হাজির করতে হবে বা জাতীয়তাবাদেরও প্রিসাইজ কোন ক্রিটিক সবার সামনে উপস্থাপন করতে হবে তা না হলে একটা অসম্পূর্ণ সমালোচনা রয়ে যাবে। এখন তাদের এই ‘উম্মাহ’ ধারণা কেন ইনক্লুসিভ না, সেটা একটা আলাপের বিষয় হতে পারে কিন্তু এর সাথে দক্ষিণপন্থার জাতীয়তাবাদী ঐক্যের ফারাকটা নির্ণয় করতে হবে। আর সর্বোপরি ইসলামিস্টদের এই ‘উম্মাহ’ ধারণার সমালোচনা নতুন ভাষায় হাজির করতে হবে।
দক্ষিণপন্থা সাধারণত ‘জাতি’ ও ‘সীমান্ত’কে রাজনৈতিক সংগঠনের মৌলিক উপাদান হিসেবে ধরে, অথচ ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা সীমান্তের ঊর্ধ্বে মুসলমান কওমের সার্বজনীনতাকে কল্পনা করে। অবশ্যই এই ‘pan-Islamic’ ঐক্যের ধারণা বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানা প্রশ্নের মুখে পড়ে, যেমন, এটি কি ‘মুসলমান জাতীয়তাবাদ’ এর এক রূপ, নাকি জাতীয়তাবাদকেই অতিক্রম করার চেষ্টা এটা খুজে বের করতে হবে।
সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা ধরনের ফেনোমেননকে সরলীকৃতভাবে ‘দক্ষিণপন্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করা একধরনের চিন্তার সীমাবদ্ধতা। বরং এটিকে বোঝার জন্য আলাদা বিশ্লেষণধারা প্রয়োজন, যা তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটকে সামনে আনে।
নয়া শতকের দার্শনিক জিজেকের একটা সেয়িং দিয়ে পজিশন আর টার্ম ব্যবহারে সতর্কতা কেন দরকার, তার একটা চিত্র হাজির করি। জিজেক এক ইন্টারভিউতে বলেন, এই যে অনেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্যাসিস্ট বলে এটা তার পছন্দ না। এটাকে তিনি ওল্ড লেফটিস্ট লেজিনেস ঠাওরান। তিনি বলেন যে, ফ্যাসিজম একটা প্রিসাইজ টার্ম এবং এটার বিভিন্ন ধরনের উপাদান আছে, তো সেই অনুযায়ী তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘লিবারেল ফ্যাসিস্ট’ বলেন। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তার পজিশন ও টার্ম ব্যবহারের সতর্কতা। বঙ্গদেশের সমস্যা মূলত এখানে দক্ষিণপন্থা ও ইসলামী রাষ্ট্র আইডিয়ার তফাতের জায়গাটাতে যখন আমাদের চিহ্নিত করতে পারা উচিত, তখন দুইটার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করার ব্যাপারটা আমরা না দেখে এই চিন্তার কসরত না করে আমরা একসাথে দুইটা টার্মকে জেনারালাইজড করে ফেলি, এটা চিন্তার দুর্বলতা হিসেবে সাক্ষ্য দেয়। ইসলামী রাষ্ট্র আইডিয়ার ক্রিটিক হাজির করতে হবে নতুন চিন্তা কাঠামো ও শব্দদ্বয়ের মাধ্যমে।
‘ওয়ার অন টেরর’ দুনিয়াজোড়া মুসলমানের বিরুদ্ধে ঘৃণার লাইসেন্স
২০০১ সালের ৯/১১ এর পর আমেরিকা ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করল। এই যুদ্ধ কাদের বিরুদ্ধে? সোজা উত্তর, মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ফ্রেমিং থিওরি অনুযায়ী, মিডিয়া যখন একটা ঘটনারে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যাতে দর্শক বিশেষ গোষ্ঠীরে দায়ী ভাবে, তখন ওই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৈধতা পায়। এডওয়ার্ড সাইদ এই ফ্রেমিং থিউরির ফলাফল হিসাবে বলেন, এর কারণে, ‘They are seen not as people, but as threats, fanatics, irrational beasts. The West has always narrated the East as its barbaric Other.’–Orientalism (1978)
Orientalism বইতে সাইদ ব্যাখ্যা করেন, কিভাবে পশ্চিমা দুনিয়া প্রাচ্যরে (মূলত মুসলমানদের) অমানবিক কইরা উপস্থাপন করে, যাহাতে শত্রু বানানো যায়। দক্ষিণপন্থার উত্থান ঠেকানো এই চিন্তাকেই রাষ্ট্রীয় নীতি বানিয়ে দ্যায়। সমস্যা তো চিহ্নিত যে, এই ইসলামকে দক্ষিণপন্থা বলে চিহ্নিত করণ ও তার মোকাবিলা হাজির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে মিডিয়ার প্ররোচনায় একটা আসলে মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং ও তার পরবর্তী রাজনীতি।
এখন একটা কথা বলি, ২০০১–২০১৫ পর্যন্ত মার্কিন নীতি ছিল মূলত ‘সন্ত্রাসবাদ দমন’। এখন তাদের নীতি ঘুরে গেছে গ্রেট পাওয়ার কম্পিটিশন এ , যেখানে প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন, রাশিয়া, ইরানকে দেখা হচ্ছে।
ওয়ার অন টেরর এর বদলে এখন টেকনো স্ট্র্যাটেজিক যুদ্ধ, সাইবার সিকিউরিটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মাইক্রোচিপ, নৌবাহিনী। ফলে ‘টেরর’ শব্দটা চাপা গেছে, কিন্তু তার জায়গায় এসেছে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি’।
কিন্তু বঙ্গদেশের মিডিয়া ফ্রেমওয়ার্ক এই নতুন শব্দ ভাষার সাথে এডজাস্ট করতে পারে নাই। দুনিয়ার ডায়নামিক চেঞ্জ হওয়ার ভাষা তার যে রপ্ত হয় নাই এটাই তাকে এখনো পুরানো আমলের ‘ ওয়ার এন্ড টেররের ‘ ভাষা কাটানোর মধ্যে আবদ্ধ করে রাখছে। সমস্যা আবার সেই নতুন ভাবে চিহ্নিতকরণের সমস্যা।
বাংলাদেশের বামপন্থা, সাম্রাজ্যবাদ আর ইসলামী ‘উপাদান’
বাংলাদেশের বামপন্থীরা সবসময় কইছে আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিমা দুনিয়ার দৌরাত্ম্যরে তারা গালি দেয়। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হইল, যখন ইসলামী রাজনীতি বা ইসলামী সংস্কৃতি সামনে আসে, তখন তারাই আমেরিকার মতো ভাষা ইউজ করে এইটা রাইট-উইং, এইটা রিঅ্যাকশনারি, এইটা ফান্ডামেন্টালিজম। এটাতে বামপন্থার তাত্ত্বিক শেকড়ের আলাপে অনেকে মার্কসরে দোষ দেন, মার্কস বলছিলেন ‘Religion is the opium of the people’ (1844)। ধর্ম হলো আফিম এটা মানুষরে নেশা ধরায়, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেয় না। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের দীর্ঘকাল বামপন্থী হিসেবে চিহ্নিত ফরহাদ মজহার তার মোকাবেলা বইতে দেখান যে, বামপন্থীরা এই কথার অর্থ বুঝে নাই। মার্কস যখন এটা লিখছিলেন, তখন সেই পরিস্থিতিতে ‘আফিম’ ছিলো বেদনানাশক, আমরা বলতে পারি মানবজীবনের শেষ আশ্রয়। এই যে মমত্ববোধের জায়গাটা না বুঝে একটা পাল্টা আগ্রাসনের বোঝাপড়া এটাই ব্যাপারটাকে ঘোলাটে করেছে। এইরকম বিপদজনক পাঠ থেকেই ধারনা করা যায় বাংলাদেশের বামরা বিশ্বাস করে ইসলামী উপাদান মানেই জনগণের মুক্তির পথে বাধা।
আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী ন্যারেটিভ কী? ৯/১১-এর পর আমেরিকা ঘোষণা দিল ‘Islamic fundamentalism is the new threat.’ (Samuel Huntington, Clash of Civilizations, 1996)। মার্কিন মিডিয়া অ্যাকাডেমিয়া যেভাবে ইসলামপন্থার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালাইল, বাংলাদেশের বামপন্থীরাও হুবহু একই ট্যাগ ইউজ করলো ডানপন্থা, সন্ত্রাসী, প্রতিক্রিয়াশীল।
এতে বাংলাদেশের বামদের দ্বৈত অবস্থান স্পষ্ট। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হইলেও ‘ইসলাম’ নামের উপাদানরে তারা শত্রু ভাবে। ফলে বামরা আসলে জনগণের সাথে কনফ্লিক্টে পড়ে যায়, কারণ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ধর্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে। ইসলামপন্থার যেকোনো দাবি বামরা গাল দেয় ‘দক্ষিণপন্থী’ নামে, কিন্তু এই গালি আসলে পশ্চিমা লিবারেল আমেরিকান চিন্তার ধার করা ভাষা।
প্রশ্ন আসতে পারে কেন এমন করে? এর তাত্ত্বিক কারণ হিসেবে বলতে হয় যে একটা ভুল পাঠ মার্কসের, সত্যি বলতে হয়তো নিজেদের পাঠকে নিজের মানুষ এবং ভূমির প্রেক্ষাপটে পাঠ করতে না পারা। রাজনৈতিক কারণ হিসাবে বলি তারা ভাবে ইসলামপন্থীরা গণআন্দোলনরে দখল কইরা ফেলতে পারে, তাই আগে হইতেই গালি মেরে আলাদা কইরা রাখা দরকার। আন্তর্জাতিক প্রভাবের কথা শুনি যেমন পশ্চিমা ফান্ডেড এনজিও, মিডিয়া আর একাডেমিক চশমা দিয়া বামপন্থীরা ইসলামপন্থারে ডানপন্থা বলতেছে।
এর ফলাফল হলো, বামরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করলেও আসলে একই ন্যারেটিভ চালায়, যেটা আমেরিকা চালায় Islamic politics = Right-wing extremism। এর ফলে ইসলামী রাজনীতি জনগণের কাছে আরও জনপ্রিয় হয়, আর বামরা আরও বিচ্ছিন্ন হয়।
একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে শেষ করি। Frantz fanon একজন বামপন্থী লেখক ও চিন্তক ছিলেন, কিন্তু সাধাসিধা ভুল রিডিং ও দেশীয় কনটেক্সট এবং পরিবেশ না বুঝা আমাদের বামদের মতো তিনি ছিলেন না। ধর্মীয় চিহ্ন যে অত্যাচারের বিরুদ্ধে একটা হাতিয়ার হতে পারে এবং তা যে অবশ্যই অনগ্রসর এবং মৌলবাদী ধর্মীয় চিহ্ন না এ সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। আলজেরিয়ার মেয়েদের হিজাবরে তিনি দেখছেন এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে। ফরাসিরা ভাবছে ‘হিজাব খুলাইলেই মুসলমান সমাজ ভাঙবো’। কিন্তু হিজাবই হইয়া গেল বিদ্রোহের চিহ্ন। ফাঁনো কইছেন, হিজাব আসলে উপনিবেশবাদ বিরোধিতার প্রতীক, মানে ‘আমরা তোমাদের মতো হইমু না’। তিনি লিখছেন এমন, ‘The veil helps the Algerian woman resist colonial assimilation it is at once a means of struggle and a sign of refusal.’ (Fanon, A Dying Colonialism, p. 44-45, 1959)
এখন বাংলাদেশের সবাইকে বলা হচ্ছে না‚ বিভিন্ন ব্যাতিক্রম তো অবশ্যই আছে। সমস্যা হচ্ছে ব্যাতিক্রমরা মেইনস্ট্রিম হইতে পারে না। এজন্য আসলে এখানে মুসলমান কমিউনিটির থেকেও ভিন্ন আইডিওলজি ধারণ করে এমন মানুষদের সাথে ডায়ালগে বসা উচিত, এখন ডায়ালগ অবশ্যই চা-পানির দাওয়াত না বরং হতে হবে পরস্পরকে সোশ্যাল স্পেস দেবার জন্য একটা জরুরতের জায়গা।
দক্ষিণপন্থা সুরতের নামে কৌশল হলো, মিডিয়া, স্মৃতি, ও শিক্ষা দিয়ে ঘৃণা ছড়ানো। মিডিয়া বলে মুসলমান মানেই, বন্দুকধারী, বোমাবাজ, টেররিস্ট। হলিউড, বলিউডে মুসলমান চরিত্র মানেই ইনফর্মার বা আতঙ্ক । মুসলমান নাম আলী, ফারুক, রহমান দিলেই সন্দেহ। পাঠ্যবই ও ইতিহাসে নজর দি। মুসলমান শাসকদের জবরদস্তি, ধর্মান্তরণ, মন্দির ভাঙা এইরকম একতরফা বয়ান। ইসলামী অবদান বা দার্শনিক চিন্তা (ইবনে খালদুন, আল গাজ্জালী) প্রায় অদৃশ্য।
ইতিহাসের দলিলে এই ঘৃণার গোড়া বহু পুরান।
স্পেনের রিকনকুইস্তা (Reconquista) মুসলমানদের ইউরোপ থেইকা উচ্ছেদ, ভারতে ব্রিটিশ Divide and Rule হিন্দু-মুসলমানে বিভাজন, বসনিয়া গণহত্যা (1995) ডানপন্থী সার্বদের হাতে হাজার হাজার মুসলমানের শহীদ, মায়ানমারে রোহিঙ্গা নিধনে বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের ছত্রছায়ায় মুসলমানদের উপর গণহত্যা ইত্যাদি। এইসব জায়গায় একটাই বিষয় কমন আর তা হইলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চাপে মুসলমান অপর হইয়া দাঁড়ায়। আর এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার সময় ইসলামপন্থী উপকরণকে দক্ষিণ পন্থা হিসেবে এডিট করা হয়।
সাম্রাজ্যবাদের ছায়াতলে দক্ষিণপন্থার সুরতের বিরুদ্ধে হাতিয়ার
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দক্ষিণপন্থার নাম দিয়া আসলে একধরনের নতুন উপনিবেশবাদের (Neo-colonialism) রাজনীতি চালাইতেছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন এইসব জায়গায় মুসলমান জনগণরে ‘দমনযোগ্য’ শত্রু হিসাবে দেখায়া সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়েছে এবং বর্তমানে এটা প্রক্সি ওয়ার চালানোর চেষ্টা চলমান ইসরায়েলকে দিয়ে। মুসলমান ভূমিগুলারে টার্গেট করবার পিছনে কেবল নিরাপত্তার কথা না, বরং তেল, ভূরাজনীতি, সামরিক বাজার এইগুলাও জড়িত। এতে নাগরিকতার সংকট মুসলমান মানেই সন্দেহ এমন কিছুর আভাসও আছে।
যেমন ভারতে NRC আর CAA এর মাধ্যমে মুসলমানদের রাষ্ট্রবিহীন কইরা ফেলার আইনগত চক্রান্ত। চীনে উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, ইউরোপ ও আমেরিকায় নাগরিক মুসলমানদের দেহতল্লাশি, নজরদারি, ভিসা জটিলতা, surveillance। এইসব নীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ, কারণ মুসলমানদেরে ‘ইনহেরেন্টলি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসাবে বানানো সহজ! তো এমন জবরদস্তির জমানায় এখন ইসলামি চিহ্নকে ‘দক্ষিণপন্থা’ বলে দমন যোগ্য করার যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবতে হবে।