জনবিতর্ক

নাশাদ ময়ুখ

জুলাই কি আগামীর পথ তৈয়ার করতে পারলো?

August 17, 2025   0 comments   1:34 pm

গণঅভ্যুত্থান যখন ঘটে তখন সোসাইটির স্ট্যাটাস কো ভেঙ্গে যায় বিধায় জনতার আকাঙ্ক্ষায় একটা ভাল স্ট্যাটাস কো তৈয়ার করার বাসনা হয় কাজেই পুরাতন বন্দোবস্ত টিকায়ে রাখার কালচার থেকে গেলে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হইতে বাধ্য। তো, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু সংস্কারের আলাপ দিয়া অভ্যুত্থান সফল করার আলাপই একটা টাইম ওয়েস্ট আলাপ যা আমরা এক বছর ধইরা করলাম।

Share

গণঅভ্যুত্থান যখন ঘটে তখন সমাজে, রাষ্ট্রে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে না। জুলাইতে আমরা তেমনটাই দেখেছি, জনতা রাষ্ট্রের অর্গানগুলার সাথে সংঘাতে জড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা, অধিকার হারানোর ক্ষোভ ও তাদের প্রতি চলা ভয়াবহ অন্যায়, অবিচার নিরসনের উপায় হিসেবে বিগত রেজিমের স্বৈরশাসনকে হটায়ে দিয়েছিল।

খেয়াল কইরেন, পয়লা বাক্যে আমি খুব সচেতনভাবে “জনতা” কইলাম, “ছাত্র-জনতা” না বইলা। প্রথমত, ছাত্রদেরকে জনতার বাইরে কোন আলাদা এন্টেটি হিসেবে আমি মনে করি না। “ছাত্র-জনতা” শব্দবন্ধ এমনিতেও ক্লিশে, জুলাইয়ের পর এর ব্যবহার, বরং, গণঅভ্যুত্থানের সকল শ্রেণি, পেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির পরিধি সংকীর্ণ করার মাধ্যমে বড়ধরনের ক্ষতিসাধন করেছে।

জুলাইয়ের পরপরই, যার ফলে আমরা দেখেছি ছাত্রদের মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের ক্রেডিট নেয়ার প্রচেষ্টা ও তা সফল হওয়ায় অন্যান্য শ্রেণি পেশার মানুষের, বিশেষত  শ্রমিকশ্রেণীর একটা বড় অংশের আত্নত্যাগ, অংশগ্রহণ নিয়া অদ্ভুত নীরবতা ও আলাপশূন্যতা। অন্যান্য পেশাজীবী তথা সর্বস্তরের জনতার জন্যেও কথা সেইমই। 

এর ফলে ছাত্ররা ধীরে ধীরে অভ্যুত্থানের দায় নিজেদের ঘাড়ে নিতে থাকলো। তারা নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো। রাজনৈতিক দল গঠন অবশ্যই ইতিবাচক ঘটনা কিন্তু এর পেছনে অভ্যুত্থানের মূলশক্তি অর্থাৎ ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষক-নারী-শিশু-পুরুষসহ আপামর জনতার অংশগ্রহণ থিকা শুধু ছাত্রদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদানকে মহিমান্বিত করার প্রক্রিয়াকে আমি অভ্যুত্থানের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করে আসতেছি।

জুলাইয়ের পরপর “আফটার ফ্যাসিস্ট”এ মানে এই সাইটে প্রকাশিত একটা লেখায় কইতেছিলাম যে সাংস্কৃতিক বিল্পব ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হবে না। শুধু আমি না, বর্তমান বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক এরিয়ায় বিচরণ এমন অনেক চিন্তাশীল মানুষও সেইম অথবা কাছাকাছি আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু কেন যেন কেউই আর এই বিষয়টা নিয়া সিরিয়াস থাকতে পারে নাই বা ডিফোকাসড হয়ে গেছে। এইটা আরেকটা আলাপ কেন এমন ঘটলো। বিস্তারিত অন্য লেখায় কোনদিন লিখবো। আজকে আলোচনা করবো ক্যান আমরা নয়া কালচারাল বন্দোবস্ত তে রূপান্তরিত হইতে পারলাম না।

এই প্রসঙ্গে শুরুতেই সাংস্কৃতিক বিউপিনিবেশিকরন(Cultural Decolonization) এর কথাই বলবো যা আমরা শুরু করতে পারি নাই।

ডিকলনিয়ালাইজেশন দুইটি ধাপে ঘটে। এর প্রথম ধাপ অর্থাৎ রাজনৈতিক স্বাধীনতা আমরা ৪৭ এ, ৭১ এ দুইবার অর্জন করেছি, ৯০, ২৪ এ দুইবার রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছি। কিন্তু, ডিকলোনিয়ালাইজেশনের ২য় ধাপ  অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ও মানসিক স্বাধীনতা  যেখানে দেশের সকল জাতিগোষ্ঠী নিজ নিজ ঐতিহ্য, ভাষা, ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি পূর্ণ মর্যাদা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবে ও  ফ্যাসিবাদী মানদণ্ড এবং প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের পরিচয় পুনর্গঠন করবে। যা আমরা অর্জন করতে পারিনাই।

শুধু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তন কইরা না যাবে সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী রূপ দেওয়া না যাবে জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে জনগণের যে বিরাট আকাঙ্ক্ষা তৈয়ার হয়েছিল তার বাস্তবায়ন ঘটানো। বরং মানসিক, সাংস্কৃতিক, শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও মিডিয়া কাঠামোর গভীর সংস্কার করা গেলে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের যে আলাপ ও তার ধারাবাহিকতায় যে  ঐক্যমত্য ঘটলো তা টিকে যেতো।

ধরেন, আমরা তো মাওলানা ভাসানীর কৃষি অর্থনীতি বা ফজলুল হকের জমি সংস্কারের প্রস্তাব নিয়া আলাপই শুরু করতে পারি নাই এত বছরে! মানে, এই দুইটা ঘটনা লিখতে লিখতে মাথায় আসলো তাই কইলাম। এমন আরও উদাহরণ দেওয়া যাইতে পারে। কী কী হইতে পারে বলেন?  

আমাদের লোকসংস্কৃতি, মাটি, নদী, গ্রামীণ জীবন ও শহরের বাস্তবতার মিশেলে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াই তুইলা আনতে পারে তেমন কোন ফিল্ম, নাটক, ও শিল্পকলা করতে পারি নাই। ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা অর্জন করা এবং সাংস্কৃতিক বিকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা জরুরত ছিলআমরা তার বিপরীত কাজটাই করেছিদেখা গেলো, বছরব্যাপী নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সমাজ ভাবনার আগ্রাসী বিভিন্ন  টুলস জোরপূর্বক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্রহীনতা ঘটালো নানাবিধ মব সৃষ্টির মাধ্যমে

ধরেন, বিজ্ঞান, শিল্প, প্রযুক্তি ও ব্যবসায় বাংলাদেশি উদ্ভাবনকে গতিশীল করার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া যেতো। পশিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির বিকল্প প্রস্তাবনা হিসেবে সমবায়ভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব জীবনধারার প্রচার করা যেতে পারতো। ফ্যাসিবাদী কাঠামো টিকিয়ে রাখার  অন্যতম টুলস হিসেবে ক্রিয়াশীল দুর্নীতি ও লুটপাট শুধু আইন, সংবিধান ও সনদ দিয়া রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা সম্ভব না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত জাতীয় কনশেনশাস আনতে না পারলে হবে না। সমাজে যে কোন আচারের একটা মানদণ্ড থাকে যা ক্রস করলে সেইটা অনাচার হয়। আমাদের পুঁজিকেন্দ্রিক সমাজ থিকা দুর্নীতি নাই হয়ে যাবে সেইটা না, ঐ সীমা ক্রস কইরা আওয়ামী রেজিমের মতন অনাচারে যেন পরিনত না হয় তার জন্য জনতার একতা প্রয়োজন। জনগনের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে না পারলে যে কোন সংস্কার আরোপিত অবস্থায় পতিত হবার মাধ্যমে একটি বিরাট মূলায় পরিণত হয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে যায়।

ধরেন, দেশীয় উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি ঘটানো যেতো। স্থানীয় কারিগর, দেশীয় শিল্প রক্ষার্থে, নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যেতো। দারিদ্র্য দূরীকরণে, বেকার সমস্যা সমাধানে সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে এই ধরনের আরো কাজ হইতে পারতো, এই কাজ গুলা সে সরকারীভাবেই করতে হইতো তা না, বরং অভ্যুত্থানের সময়ে বিনিদ্র রাত জাগা, নতুন স্বপ্ন দেখা প্রতিটি মানুষকে আজাইরা অলস বসায়ে না রেখে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত করা যাইতো।

কিন্তু সবাই আবারো অতীতে ঢুইকা গেলো, কেউ ৭১ এ, কেউ ৪৭ এ। কেউ বুঝল না শুধু অতীত ঘাইটাই অতীতের ফায়সালা হয় না। এইটা অর্ধেক ফয়সালা, বাকী ফয়সালা হয় ভবিষ্যতে, আপনার সফলতার শব্দে বর্তমান লেখা হইলে, এই বর্তমান, একটা প্রজন্মের কাছে সোনালী অতীত হবার মাধ্যমে আপনার অতীতের ফয়সালা ঘটাবে তখন। এইটা অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থান পরবর্তী নেতৃত্বের মধ্যে কারো স্টেটসম্যান হয়ে উঠতে না পারার রাজনৈতিক ব্যর্থতা। ইন্টেলেকচুয়ালিও এইটা একটা বিগ ফেইলর, এই এক বছরের স্মুতিতে।

আমরা সবাই যেন এই সহজ সত্যটা ভুলে গেছি যে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় রূপান্তর করা না গেলে শুধু শাসক বদলায়।  চিন্তা, শিক্ষা, শিল্প, ভাষা ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ জনগণ নিজেদের হাতে নিতে পারে না।

গণঅভ্যুত্থান যখন ঘটে তখন সোসাইটির স্ট্যাটাস কো ভেঙ্গে যায় বিধায় জনতার আকাঙ্ক্ষায় একটা ভাল স্ট্যাটাস কো তৈয়ার করার বাসনা হয় কাজেই পুরাতন বন্দোবস্ত টিকায়ে রাখার কালচার থেকে গেলে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হইতে বাধ্য। তো, শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন ও প্রাতিষ্ঠানিক কিছু সংস্কারের আলাপ দিয়া অভ্যুত্থান সফল করার আলাপই একটা টাইম ওয়েস্ট আলাপ যা আমরা এক বছর ধইরা করলাম।

এ সেট অব করনীয় নিয়া কাজ শুরু করা গেলে ও জনতার মধ্যে অভ্যুত্থানের স্পিরিট ফিরায়ে আনার কাজ শুরু করা গেলে এখনো সম্ভব বইলা আমি বিশ্বাস করি। পলিটিশিয়ানরা ফেইল করলে ইন্টেলেকচুয়ালদের কাজ বেড়ে যায়, দায়িত্বও। যার যার রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতকে,  দেশ গড়ার স্বার্থে আশু করনীয় ঠিক করতে ও তাতে ঐক্যবদ্ধ থাকতে কাজে লাগানো উচিত বইলা আমি মনে করি। আগে মানুষকে খাইতে দেন, পড়তে দেন, ঘুমাইতে দেন, একটু স্বাভাবিক শ্বাস নিতে দেন, তারপর তার পাশে বইসা বলেন আমরা একটা নতুন সংবিধান বানাবো, তুমি তাতে আরও ভাল থাকতে পারবা, আরও ভাল ভাল খাবার পাইবা, আরও শান্তিতে ঘুমাইবা  লাইফে, তখন কার ঠ্যাকা পরবে পুরাতন সংবিধানে না খাইয়া মরার?   

Leave the first comment